নোকিয়া মোবাইলের জন্ম, বিকাশ এবং বর্তমান

খুব অল্প কিছু কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান আছে এমন, যা কেবল সাধারন জনগণের সাথে সংযোগ স্থাপনই করেনি বরং বিশ্বে এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নোকিয়া কর্পোরেশন তেমনই একটি সুপরিচিত নাম। ১৮৬৫ সালে জন্ম নেয়া এই প্রতিষ্ঠানের জন্মস্থান ফিনল্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটি বহন করা যায় এমন ডিভাইস উৎপাদন করে। এদের প্রধান উৎপাদিত পণ্য মুলত মোবাইল ফোন। ফোন ব্যবহারকারী এমন একজনও হয়ত পাওয়া যাবে না যে “নোকিয়া মোবাইল” সম্পর্কে জানে না।

poat-image

আনুষ্ঠানিকভাবে নর্ডিক মোবাইল টেলিফোন (এনএমটি) নামে পরিচিত, কোম্পানিটি ১৯৮১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের তৈরি করে। এটিই ছিল মোবাইল যুগের সূচনা। নোকিয়া ডি.এক্স ২০০, তাদের প্রথম ডিজিটাল টেলিফোন সুইচ যা এক বছর পর কার্যক্রম শুরু করে। যেটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারন একটি ধারনা হিসেবে, ধীরে ধীরে তা আকার নেয় এক বিশাল মোবাইল বিপ্লবের।

poat-image

নোকিয়া “মোবিরা টকম্যান” নামে একটি ফোন লঞ্চ করে।

poat-image

১৯৮৭ সালে বিশ্ববাসী দেখে “মোবিরা সিটিম্যান” কে, এটি ছিল প্রথম হ্যান্ডসেট ফোন। নোকিয়া সিডিএম, ডাব্লিউসিডিএম এবং জিএসএম, সব ধরনের ফোনই তৈরি করে। এছাড়া নেটওয়ার্কিং এর পণ্যও তৈরি করে থাকে সিমেন্সের সাথে যৌথ ভাবে।

poat-image

১৯৯১ সালে যখন জিএসএম এর অস্তিত্ব প্রকাশ পায় তখন প্রথম জিএসএম কলের জন্য নোকিয়ার যন্ত্রাংশে তা সংযোজন করা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটা সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৯২ সালে নোকিয়ার প্রথম জিএসএম হ্যান্ডসেট ১১০১ বাজারে আত্মপ্রকাশ করে।এটি তাৎক্ষনিক ভাবেই দারুন সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। নোকিয়া জিএসএম ফোন ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো স্যাটেলাইট কল করা হলে, জনপ্রিয় ট্রেডমার্ক নকিয়া টিউন চালু করা হয়।

poat-image

২১০০ সিরিজটি তার সিগনেচার রিংটোন হিসাবে প্রথম হ্যান্ডসেট ছিল। চার বছর পর ১৯৯৮ সালে, নোকিয়া মোবাইল ফোনের দিক দিয়ে বিশ্বের নেতা হয়ে ওঠে।

poat-image

নিরলস গবেষনার পাশাপাশি নোকিয়া মোবাইলের নতুন নতুন উদ্ভাবন অব্যাহত ছিল। ১৯৯৯ সাল, এ বছরই WAP হ্যান্ডসেট নোকিয়া ৭১০০ কে প্রথম সামনে আনা হয়।

poat-image

২০০২ সালে নোকিয়া ৬৬৫০ হ্যান্ডসেটটির মাধ্যমে প্রথন ৩জি চালু করা হয়। এরপর ২০০৩ সালে এন-গেজ মোবাইল গেম চালু হওয়ার সাথে সাথে তরুণদের মধ্যে একটি প্রবল উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছিল নোকিয়া ফোন নিয়ে।  ২০১১ সাল পর্যন্তই মোবাইলের রাজ্যে নোকিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।

poat-image

এরপর বাজারে আবির্ভাব ঘটে টাচস্ক্রিনের আর এর সাথে প্রতিযোগীতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে থাকে নোকিয়া। গুগোলের তৈরিকৃত এনড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমটিকে ব্যবহার করবে না নোকিয়া, এমন ঘোষনার ফলে শেয়ার মার্কেটেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শেয়ারের দাম ৪০ ডলার থেকে নেমে ২ ডলারে আসে।

এই সময় ভবিষ্যতের সমস্ত স্মার্টফোনগুলির অপারেটিং সফটওয়্যার হিসেবে উইন্ডোজ কে ব্যবহার করার জন্য নোকিয়া মাইক্রোসফটের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। উইন্ডোজ 8 নিয়ে বাজারে প্রথম আসে লুমিয়া সিরিজের হ্যান্ডসেট। এই ক্যাটাগরির ফোন গুলোর মধ্যে লুমিয়া সিরিজকে প্রথম ধরা হয়। তবে আবারো নোকিয়াকে ব্যর্থতার মুখ দেখতে হয়।

poat-image

এবার নোকিয়ার আরো এক অধ্যায়ের কথা।মাইক্রোসফটের সাথে চুক্তিবব্ধ হয়েও নোকিয়া কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে ব্যর্থ হয় এবং ২০১৪ সাথে মাইক্রোসফটের কাছে মোবাইলের ব্যবসাটি বিক্রি হয়ে যায়। ২০১৫ সালে এসে কোম্পানির সিইও রাজিভ সুরি স্মার্টফোন তৈরির ঘোষনা দেয়। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বার মাইক্রোসফটের সাথে ফোন বিক্রির চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ২০১৬ সালে এইচএমডি গ্লোবালের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় নোকিয়া।  এই চুক্তির অধীনে ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারী বাজারে প্রথম আনা হয় দুটি ফিচার ফোন নোকিয়া ১৫০ এবং নোকিয়া ১৫০ ডুয়াল সিম। অবশেষে ৯ জানুয়ারী ২০১৭ সালে বাজারে আসে নোকিয়ার বহু প্রতিক্ষিত প্রথম এনড্রয়েড স্মার্টফোন নোকিয়া ৬।

দিনে দিনে কোম্পানীর অগ্রগতি এবং বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।সম্প্রতি, কাতারের প্রথম এলটিই-এ সেবাটি ওরডু কর্তৃক নকিয়া নেটওয়ার্কগুলির সাহায্যে চালু করা হয়েছিল। নকিয়াও জিএসএম-আর নেটওয়ার্ক ওয়ারস-লোডজ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।

সামাজিক বিপর্যয়ের সময়ে নোকিয়া একটি ভারতীয় এনজিও সেভ দ্য চিলড্রেনের সাথে সহযোগিতা করে দুর্যোগের সময় শিশুদের সুরক্ষা দিয়েছে। এই কার্যক্রমটি  দিল্লি, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান এবং তামিলনাডুতেও চালু করা হয়েছে। নোকিয়া আজ ১২০ টি দেশের ৯০,০০০ এরও বেশি লোককে কর্ম সংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে এবং ১৫০ টিরও বেশি দেশে সফলতার সাথে ব্যবসা করছে। সেবা প্রদানের মাধ্যমে সন্তষ্ট করে লক্ষ লক্ষ গ্রাহককে।

 

শেষ কথা:
কোম্পানীর মুল্যবোধের মাঝেই এর সফলতার গোপন সূত্র লুকিয়ে আছে। নোকিয়া মোবাইল প্রতিটা সম্পন্ন কাজেই মানুষের মুল্যায়নে বিশ্বাস করে। পরিবেশের সংরক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত জীবন যাপনের জন্য নতুন নতুন উদ্ভাবন প্রভৃতি ক্ষেত্রে সহযোগীতার প্রয়াসেই এই সকল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নোকিয়া সাধারণ মানুষের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছানোর মাধ্যমে জীবনকে স্পর্শ করেছে যা শুধু ব্যবহারেই সহজ নয় বরং এটি সাধারন জনগণের পকেটের খরচকেও সীমিত করে দিয়েছে।

আপনি কি সাহায্য পেয়েছেন

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন নিবন্ধন করুন