শিশু জন্মের পর শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে মায়ের যে পরিমাণ পুষ্টি চাহিদা দরকার

প্রসবোত্তর সেবা নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি অপরিহার্য অংশ। প্রসবের পর থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কে ‘প্রসবোত্তর কাল’বলা হয়। এ সময় মায়ের বিশেষ সেবা প্রয়োজন। কারণ এই সময় শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের শরীরে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। শিশুর বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান মায়ের দুধে বিদ্যমান; যা শিশু মায়ের কাছ থেকে পেয়ে থাকে। এজন্য এ অবস্থায় মায়ের শরীর সুস্থ রাখার জন্য সব ধরণের পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ বাড়তি খাবার এবং বাড়তি যত্নের প্রয়োজন।

poat-image

স্তন্যদানকালে মায়ের খাদ্য উপাদানের চাহিদা, বিশেষ করে ক্যালরি, প্রোটিন, খনিজ লবণ ও ভিটামিনের চাহিদা সর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পায়। নিচে এর কারণ দেয়া হল:

১. শিশুর জন্য মায়ের বুকে যে দুধের উৎপাদন হয় তাতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে উৎকৃষ্ট মানের প্রোটিন, ক্যালোরি ও ভিটামিন ।

২. প্রসূতিকালীন সময়ে মায়েদের পুষ্টির চাহিদা গর্ভকালীন সময় থেকে বেশী থাকে। মায়ের নিজের দেহের রক্ষনাবেক্ষণে, দুধ নি:সৃত করার শক্তির জন্য এই বাড়তি পুষ্টি চাহিদার প্রয়োজন হয়।

poat-image

১০০ মিলিলিটার মায়ের দুধের শক্তিমূল্য ৭২ কিলোক্যালরি। এই দুধ প্রস্তুত করতে মাকে আরো অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হয়। প্রতি ৮০ কিলোক্যালরি  মূল্যের দুধ প্রস্তুত করতে মায়ের প্রয়োজন হয় ১০০ কিলোক্যালরি। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে যে প্রতিদিন যে দুধ নি:সৃত হয় তার পরিমাণ ৮৫০ মিলিলিটার এবং এর শক্তি মূল্য প্রায় ৬০০ কিলোক্যালরি। এই শক্তিমূল্যের দুধ প্রস্তুত করতে মাকে খরচ করতে হবে ৭৫০ কিলোক্যালরি। স্তন্যদানকালের এই বিপুল চাহিদার কিছু অংশ পূরণ করার উদ্দেশ্যে গর্ভধারণকালে মায়ের দেহে মেদরূপে অতিরিক্ত শক্তি জমা হতে থাকে। এই মেদ থেকে ক্যালরি গ্রহণ করে স্তনদানকালে মা দুধ প্রস্তুত করে থাকেন। হিসেব করে দেখা গেছে যে দুধ প্রস্তুতের জন্য খাদ্য থেকে প্রতিদিন ৫৫০ কিলোক্যালরি গ্রহণ করলে বাদ বাকী টুকু দেহের মেদ থেকে খরচ করে মা প্রতিদিন ৮৫০ মিলিলিটার দুধ প্রস্তুত করতে পারেন।

poat-image

প্রসূতি মায়ের আমিষের প্রয়োজনও তার নিসৃত দুধের পরিমাণ থেকেই হিসাব করা হয়। মায়ের দুধের আমিষের পরিমাণ শতকরা ১.২ গ্রাম। অতএব প্রতিদিন ৮৫০ মিলিলিটার দুধ নি:সৃত হলে এতে ১০ গ্রাম আমিষ থাকবে । যে আমিষ সাধারনত মিশ্রিত খাদ্য থেকে পাওয়া যায় সেটি যথেষ্ট নয়। এই বিবেচনা করে প্রসূতি মায়ের খাদ্যে প্রতিদিন ২০ গ্রাম অতিরিক্ত আমিষ দেওয়ার জন্য অনুমোদন করা হয়েছে। এই আমিষ প্রাণিজ ও ডাল জাতীয় (মাছ, ডিম, দুধ ও মাংস) খাদ্য থেকে আসা বাঞ্চনীয়।

poat-image

প্রসূতি মায়ের দুধে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম নির্গত হয়। খাদ্যে যথেষ্ট ক্যালসিয়াম না থাকলে মা তার নিজের অস্থি থেকে ক্যালসিয়াম সরবরাহ করে দুধ প্রস্তুত করেন। এতে মায়ের অস্থি ক্ষয় হতে থাকে। এ সময় মায়ের খাদ্য এমন হওয়া উচিত যেন এই অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ হয় ও মায়ের অস্থি রক্ষা পায়। এই কারণে স্তন্যদানকালে ৬০০ মিলিগ্রাম অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

poat-image

লৌহ বা আয়রন একটি খনিজ উপাদান যা রক্তের তৈরির জন্য অপরিহার্য। রক্তে হিমোগ্লোবিন নামে একটি উপাদান থাকে। এই হিমোগ্লোবিন ফুসফুস থেকে মাংসপেশীতে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন বহন করে যার কারণে শরীর কর্মক্ষম থাকে এবং মাংসপেশী থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ফুসফুসে প্রেরণ করে। কোষ বৃদ্ধি ও উৎপাদনে লৌহ কার্যকর ভূমিকা রাখে। শরীরের ৭০ শতাংশ লৌহ লোহিত কনিকায় হিমোগ্লোবিন থাকে, বাকি ২৫ শতাংশ লৌহ যকৃত ও অস্থিমজ্জায় জমা থাকে এবং অল্প পরিমাণ মাংসপেশীতে ও এনজাইমে থাকে।

poat-image

মায়ের খাদ্যে ভিটামিন কম থাকলে দুধে ভিটামিনের পরিমাণ কমে যায়। এইজন্য মায়ের খাদ্যে প্রচুর ভিটামিন সরবরাহ করা উচিত। বিশেষ করে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন এ ও ডি এবং পানিতে দ্রবণীয় থায়ামিন, রাইবোফ্লেভিন, নায়াসিন ও ভিটামিন সি এর চাহিদা এসময় খুবই বৃদ্ধি পায় ।‘বিশ্বস্বাস্থ্য’ সংস্থা মায়ের দুধ পরীক্ষা করে দেখেন যে ৮৫০ মিলিলিটার দুধে প্রায় ৪২০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ থাকে। সূতরাং দুধ ক্ষরনের জন্য মাকে অতিরিক্ত ৪৫০ মা:গ্রা: ভিটামিন খেতে পরার্মশ দিয়েছে । আমাদের মত গরীব দেশে যেখানে ক্যারোটিন থেকেই আমাদের ভিটামিন এ-এর চাহিদা পূরণ হতে হয় য়েখানে প্রায় ১৬০০ মি:গ্রা ক্যারোটিন খাওয়া দরকার বলে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি মনে করেন। দৈনিক ৪০০ মা:গ্রা: শাকসবজি থেকে ভিটামিন এ আসতে পারে।

poat-image

মিষ্টি আলু, ভাত, সয়াপ্রোডাক্ট, কলিজা ইত্যাদিতে থায়ামিন পাওয়া যায়। দুধ, দই, পাউরুটি, কলিজা এবং মাশরুম এ রাইবোফ্লাভিন থাকে। FAO/ WHO বিশেষজ্ঞ দলের মতে প্রতি ১০০ কিলোক্যালরি শক্তির সাথে ০.৪ মি: গ্রা: থায়ামিন ও ০.৫৫ মি: গ্রাম রাইবোফ্লেভিন খাওয়া দরকার । যেহেতু স্তন্যদানকালে প্রতিদিন মায়ের শক্তির চাহিদা বৃদ্ধির পরিমাণ ৫০০-১০০০ কি: ক্যালরি হয়, অতিরিক্ত ০.৪ মি: গ্রাম থায়ামিন ও অন্তত ০.৪ মি:গ্রা: রাইবোফ্লেভিন এসময় গ্রহণ করা প্রয়োজন।

poat-image

দৈনিক অতিরিক্ত ১০০০ ক্যালরির খাদ্যশক্তি গ্রহণের জন্য এ সময় অতিরিক্ত ৫ মি: গ্রা: নায়াসিন অনুমোদন করা হয়েছে। আমাদের দেশে স্তন্যদানকারী মায়েরা প্রায়ই এনিমিয়ায় ভোগেন সে জন্য ফলিক এসিড ও ভিটামিন বি ১২ যেন তাদের খাদ্যে যথেষ্ট পরিমাণে থাকে সে দিকে লক্ষ্য রাখা উচিৎ। গরু ও খাসির কলিজা ভিটামিন বি ১২ এর উৎকৃষ্ট উৎস।

poat-image

মায়ের দুধে গরুর দুধ অপেক্ষা ৫ গুন বেশী ভিটামিন সি থাকে। সুতরাং স্তন্যদান কালে মায়ের খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি দেওয়া দরকার। বিশেষজ্ঞ দল এ সময় দৈনিক অতিরিক্ত ৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এর অনুমোদন করেছেন। অনেক সময় দেখা যায় যে উন্ন্য়নশীল দেশে দরিদ্র প্রসূতি মা অত্যন্ত অল্প খাদ্য খেয়েও প্রচুর দুধ উৎপন্ন করে সন্তান পালন করতে সক্ষম হন। এই সকল ক্ষেত্রে মা তার নিজের দেহের বিনিময়ে সন্তানের জন্য দুধ প্রস্তুত করে থাকেন । কাজেই এ সময় প্রয়োজনমত খাদ্য গ্রহণ করা দরকার।

আপনি কি সাহায্য পেয়েছেন

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন নিবন্ধন করুন